এক বছরে মৎস্য খাতে রফতানিতে আয় ৪৭৯০ কোটি টাকা - জনবার্তা
ঢাকা, বুধবার, ২০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এক বছরে মৎস্য খাতে রফতানিতে আয় ৪৭৯০ কোটি টাকা

জনবার্তা প্রতিবেদন
জুলাই ২৪, ২০২৩ ১:৪৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ফলে বিশ্ববাজারে আর্থিক মন্দাবস্থা থাকা সত্ত্বেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে আয় হয়েছে চার হাজার ৭৯০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ২০৪১ সালে মাছ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৫ লাখ মেট্রিক টন।

সোমবার (২৪ জুলাই) জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৩ উপলক্ষে মৎস্য ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

‘নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ, গড়বো স্মার্ট বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ ২৪ জুলাই থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৩ উদ্‌যাপন হতে যাচ্ছে। মাছ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের আপামর মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত একটি প্রযুক্তিনির্ভর, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও উন্নত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয়ে এবারের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উদযাপন করা হচ্ছে।

লিখিত বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ২০৪১ সালে মাছ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৫ লাখ মেট্রিক টন, যা বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৮ গুণ বেশি। এই পরিমাণ মাছ উৎপাদন করতে হলে আমাদের খামার যান্ত্রিকীকরণের পাশাপাশি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অনুষঙ্গ অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মৎস্য চাষ ও ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে ব্যবহার করতে হবে। শুধু মাছের পর্যাপ্ত উৎপাদনই নয় বরং এসব মাছ যাতে মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ হয় সে বিষয়টিও সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। সরকারের কঠোর নজরদারির কারণে মাছ বাজারগুলো এখন ফরমালিনমুক্ত হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ও সামুদ্রিক জলাশয়ে দূষণ প্রতিরোধ করতে হবে। সরকারি দফতর-সংস্থা এ লক্ষ্যে কাজ করছে। এ বিষয়ে আপামর জনসাধারণকেও সচেতন হতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য মৎস্য খাতের গুরুত্ব অনুধাবন করে নানা দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার দূরদর্শী দিক-নির্দেশনায় বর্তমান সরকার কর্তৃক অভ্যন্তরীণ মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয় এবং সামুদ্রিক জলাশয়ের উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার জন্য সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

রেজাউল করিম বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে উন্নীতকরণে লক্ষ্য বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জেলেদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, নিরাপদ মৎস্য উৎপাদন ও সর্বোত্তম উৎপাদনশীলতা নিশ্চিতকরণ, মৎস্য অভয়াশ্রম ও সংরক্ষিত এলাকা স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, ইলিশ সম্পদের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা বিকাশে সামুদ্রিক মাছের মজুদ নিরূপণ ও স্থায়িত্বশীল আহরণ, মাছের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য ও মৎস্যপণ্যের ভ্যালুচেইন উন্নয়ন, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা প্রদান, মৎস্য ও মৎস্যপণ্য রফতানি বাজার সম্প্রসারণসহ নানাবিধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

মন্ত্রী বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪৭ দশমিক ৫৯ লাখ মেট্রিক টন, যা ২০১০-১১ অর্থবছরের মোট উৎপাদনের (৩০ দশমিক ৬২ লাখ মেট্রিক টন) চেয়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি। বর্তমানে মৎস্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ায় মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণ ৬০ গ্রাম চাহিদার বিপরীতে বৃদ্ধি পেয়ে ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রামে উন্নীত হয়েছে। দেশের মোট জিডিপির ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ২২ দশমিক ১৪ শতাংশ মৎস্য উপখাতের অবদান। বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ ১৯৫ লাখ তথা প্রায় ১২ শতাংশের অধিক মানুষ এ খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘দ্যা স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২২’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য আহরণে বাংলাদেশ তৃতীয়, বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে পঞ্চম, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম ও তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের উন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করে তাদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। জাটকা সংরক্ষণে চার মাস পরিবার প্রতি মাসিক ৪০ কেজি এবং ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের জন্য পরিবার প্রতি ২৫ কেজি হারে চাল প্রদান করা হচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাটকা ও মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে নয় লাখ ১৫ হাজার ৭৫৬টি জেলে পরিবারকে মোট ৭১ হাজার ৬১১ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও প্রতিবছর ৬৫ দিন সমুদ্রে মাছ ধরা নিষিদ্ধকালে উপকূলীয় জেলার নিবন্ধিত জেলেদের মাসিক ৪০ কেজি হারে ভিজিএফ (চাল) বিতরণ করা হচ্ছে। তাছাড়া ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ইলিশ আহরণকারী ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ১০ হাজার ইলিশ-জাল বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দরিদ্র জেলেদের সঞ্চয়ী করে তোলা ও আপদকালীন জীবিকা পরিচালনা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সহায়ক তহবিল গঠনের জন্য তিন কোটি ৫০ লাখ টাকার ‘ইলিশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন তহবিল’ গঠন করা হয়েছে। এছাড়া সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের আওতায় আইডি কার্ড প্রদানের জন্য এক লাখ ৫০ হাজার মৎস্যজীবীর ডাটাবেইজ হালনাগাদ করা হয়েছে।

তিনি জানান, উপকূলীয় মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে ৫২ হাজার ৪৯৩টি মৎস্যজীবী পরিবার সমন্বয়ে ৪৫০টি মৎস্যজীবী গ্রাম সংগঠিত করা হয়েছে। সমুদ্রগামী মৎস্য নৌযানগুলোকে যথাযথভাবে তদারকি, নিয়ন্ত্রণ এবং সার্ভিল্যান্স করার জন্য ডিজিটালাইজ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ৩৯ প্রজাতির দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজনন কৌশল ও চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দেশীয় মাছের লাইভ জিন ব্যাংক। এই জিন ব্যাংকে এখন পর্যন্ত ১০২ প্রজাতির দেশীয় মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে নিয়মিতভাবে পোনা অবমুক্তি ও বিল নার্সারি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিপন্নপ্রায় মৎস্য প্রজাতি সংরক্ষণ, অবাধ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্তমানে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৪৯৪টি অভয়াশ্রম পরিচালিত হচ্ছে।