সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ মানুষকে সচেতন করতে ৩০ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সাল থেকে সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে আসছিল সংগঠনটি। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, পুলিশ ও একাধিক সংগঠনের পরিসংখ্যানে মিল না থাকা ও বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ বছর থেকে এ পরিসংখ্যান প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিসচা।
এ সময় বিভ্রান্তি দূর করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদফতর, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিআরটিএ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ সেল গঠনের দাবি জানান তিনি।
সোমবার (২৯ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এর সড়ক দুর্ঘটনার বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যান নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন এ ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার এবং সড়ক নিয়ে কাজ করার যে ইতিহাস রচিত হয়েছে সেই ইতিহাসের পথপ্রদর্শক নিরাপদ সড়ক চাই। এই আন্দোলনটির মাধ্যমেই এই ইতিহাসটির সূচনা হয়েছে। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পথচলায় সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে জনমত তৈরির পাশাপাশি এর কারণ এবং তার প্রতিকারে সুপারিশমালাসহ নানা কর্মকাণ্ড পর্যায়ক্রমে করে আসছি। এই প্রেক্ষাপটে নিসচা ২০১২ সাল থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে আসছে। আমরা সরকার ও দেশবাসীকে জানিয়ে আসছি এই কাজটি আমরা আমাদের সীমিত ক্ষমতার মধ্যে শুরু করেছি। সারাদেশে আমাদের যতগুলো শাখা রয়েছে তাদের দেওয়া তথ্য এবং পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল-এর সংবাদ ও বিভিন্ন মাধ্যমকে ব্যবহার করে আমরা এই তথ্য সংগ্রহ করতাম। সেইসঙ্গে বলেও আসছি এটা পর্যাপ্ত নয় এবং ডাটা সংগ্রহের জন্য এটা যথেষ্ট নয়। আমরা যে পদ্ধতি অবলম্বন করছি সেটা সেকেন্ডারি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করে আসছি। ২০১২ সাল থেকে ‘সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান’ ২০২২ সাল পর্যন্ত জাতির সামনে তুলে ধরেছি। কিন্তু আমাদের দেখাদেখি অনেকে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান উপস্থপান করছে এবং নানা বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা এ বছর থেকে ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান আর তুলে না ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
বিভ্রান্তির চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩’ এ ২০১৫ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বা রোডক্র্যাশে মৃত্যু হয়েছে ২১ হাজার ৩১৬ জনের। তবে পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছে মৃত্যু হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৩৭৬ জনের। একইভাবে ২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে ২৪ হাজার ৯৪৪ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছে মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৬৩৫ জনের। ২০২১ সালের রিপোর্টে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে মৃত্যু হয়েছে ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০১৬ সালে প্রতি লাখে মৃত্যুহার ছিল ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০২১ সালে এই মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ১৯ জনের মতো।
অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৪৯৫ সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ২৪ জন। পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওই বছর ৫ হাজার ৯৩ দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৪৭৫ জন নিহত হয়েছে। আরও দুই একটি সংগঠনের তথ্যও এরচেয়ে অনেক বেশি। আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে সেটিও প্রত্যেক রিপোর্টের সঙ্গে মিলছে না। এতে করে দেখা যাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সরকার, পুলিশ ও বিভিন্ন রিপোর্টে ভিন্নতা রয়েছে। আমরা মনে করি এতে করে জাতি বিভ্রান্ত হচ্ছে। কারণ সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা ও বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের সকল তথ্যকে অগ্রহণযোগ্য বলে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
এ অবস্থায় তিন মন্ত্রণালয়ের যৌথ সেলের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা যেই পরিসংখ্যান দিচ্ছি তা সেকেন্ডারি ডাটা। আমরা তা বলছি, কিন্তু অন্য সংগঠনগুলো তা করছে না। একেক সংগঠন একেক তথ্য নিচ্ছে। এতে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এমনকি সরকারের দুই সংস্থ্যা স্বাস্থ্য অধিদফতর ও বিআরটিএ এর তথ্যেও পার্থক্য রয়েছে। এ অবস্থায় আমরা চাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্বাস্থ্য অধিদফতর ও সড়ক পরিবহনের বিআরটিএ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি সেল গঠনের মাধ্যমে ডাটা তৈরি করুক। এতে সকল বিভ্রান্তি দূর হবে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি কোনো বেসরকারি সংগঠন বা কোনো ব্যক্তির পক্ষে প্রকৃত চিত্র তুলে আনা সম্ভব নয়। এর জন্য সরকারের একটি সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল এবং লোকবলের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়াও প্রযুক্তিগত ডেভেলপমেন্টেরও দরকার রয়েছে- যা কোনো ব্যক্তি উদ্যোগে করা সম্ভব নয়। মোটকথা এখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহযোগিতা অপরিহার্য।

