ফের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ! - জনবার্তা
NA 1
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ!

জনবার্তা প্রতিবেদন
ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৪ ১:০৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে সঙ্ঘাতের জেরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্ত শান্ত থাকলেও টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের ওপারে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্ঘাত এখন মংডুর দিকে ছড়িয়েছে। সেখানে দুই পক্ষের তুমুল সংঘর্ষ চলছে বলে জানা গেছে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত রাখাইনের মংডু শহর ও এর দক্ষিণাঞ্চল থেকে থেমে থেমে গোলাগুলি, মর্টার শেল ও ভারী অস্ত্রের শব্দ শোনা গেছে। গতকাল সকালে এপারে দু-তিনটি বিকট শব্দের সাথে কম্পন অনুভূত হয় বলে জানিয়েছেন সীমান্তের বাসিন্দারা। সেন্টমার্টিনে ভ্রমণে আসা পর্যটকরা বিকট শব্দ শুনতে পেয়ে স্থানীয়দের কাছে জিজ্ঞাসা করছেন ‘এই শব্দ কিসের’। এ দিকে শাহপরীর দ্বীপে মিয়ানমার থেকে গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গা নারীসহ পাঁচজন অনুপ্রবেশ করেছে। রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের জেরে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকেছে বলে জানা গেছে।

গতকাল শনিবার বিকেল ৪টায় একটি ছোট মাছ ধরার ডিঙি নৌকায় নাফ নদ পার হয়ে ওই রোহিঙ্গারা শাহপরীর দ্বীপ জেটি ঘাটে এসে অবস্থান করেন। তাদের সাথে নৌকার মাঝিমাল্লাও ছিলেন। এ বিষয়ে শাহপরীর দ্বীপের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আবদুস সালাম বলেন, ‘বিকেলে একটি ডিঙি নৌকায় মিয়ানমার থেকে পাঁচ রোহিঙ্গা এসে আমাদের জেটি ঘাটে পৌঁছে। খবর পেয়ে বিজিবি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। শুনেছি, রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তারা এখানে চিকিৎসা নিতে এসেছেন।’ এ বিষয়ে টেকনাফ বিজিবির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জেটি ঘাটের দোকানি মো: সেলিম সাংবাদিকদের জানান, মিয়ানমারের একটি ডিঙি নৌকা শাহপরীর দ্বীপ ঘাটে এসেছে। তাতে একজন গুলিবিদ্ধ নারীসহ পাঁচজন রোহিঙ্গা নাগরিক আছেন। নৌকায় ওই রোহিঙ্গা নারীর শরীরে স্যালাইন চলছিল। শাহপরীর দ্বীপ জেটি ঘাটে জেলে মো: ইউনুছ বলেন, শাহপরীর দ্বীপ সীমান্তের ওপারে একটি ছোট নৌকা নিয়ে এক গুলিবিদ্ধ নারী চিকিৎসার জন্য এপারে আসেন। সেখানে গুলিবিদ্ধ নারীসহ পাঁচজন রোহিঙ্গা ছিল।

গত দুই সপ্তাহ ধরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সঙ্ঘাতের আঁচ লাগে বাংলাদেশ সীমান্তের বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে। টানা কয়েকদিন সঙ্ঘাতের পর পাঁচ দিন ধরে নাইক্ষ্যংছড়ি ও উখিয়া সীমান্ত পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত। তবে গত তিন দিন ধরে টেকনাফের পূর্বে ও দক্ষিণাংশের ওপারে রাখাইনের মংডুতে তুমুল সংঘর্ষ চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সেখানে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) কয়েকটি সীমান্তচৌকি রয়েছে। এসব চৌকির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সাথে লড়াই চলছে। এ নিয়ে এপারের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে।
টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম জানান, শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার পর থেকে শাহপরীর দ্বীপ সীমান্তে আবারো গোলাগুলি শব্দ শোনা গেছে। সকাল থেকে ১০টা থেকে ১৫ মিনিট পর পর শোনা যাচ্ছে এক-দু’টি করে গুলিবর্ষণের শব্দ। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে থেকে শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে থেমে থেমে গোলাগুলি ও ভারী গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে রাতে ঘুম ভাঙে স্থানীয়দের। আতঙ্কে নাফ নদীতে স্থানীয় জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। তবে শনিবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটলেও আওয়াজ গত দুইদিনের চেয়ে কম হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের আতঙ্ক কিছুটা কমেছে।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানান, গত তিন দিন ধরে গোলাগুলির শব্দ সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দারাও শুনে আসছে। তিনি জানান মিয়ানমার অভ্যন্তরে সঙ্গাতের জেরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌরুটে দুইটি পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করলেও পর্যটকের সংখ্যা কমে গেছে। পাশাপাশি নিতান্ত জরুরি ছাড়া টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে বন্ধ রয়েছে স্থানীয়দের পরিবহনকারি নৌযান চলাচলও।

টেকনাফের ইউএনও মো: আদনান চৌধুরী জানিয়েছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তের লোকজনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমার থেকে নিপীড়নে বাস্তুচ্যুত হয়ে রাখাইনের ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় আশ্রয় শিবিরগুলোতে বসবাস করছেন। তাদের বেশির ভাগই ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নৃশংস অভিযানের সময়ে পালিয়ে এসেছিলেন।

সংবাদমাধ্যমে তুমুল সংঘর্ষের খবর
এদিকে বিবিসি জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে যখন সীমান্তবর্তী এলাকায় সঙ্ঘাত শুরু হয়, তখন প্রথম কয়েক দিন সারাদিন ধরেই গুলি আর বোমার আওয়াজ পাওয়া গেছে বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তসংলগ্ন গ্রামগুলো থেকে। সেসব এলাকা মূলত বাংলাদেশের বান্দরবান, কক্সবাজার এবং ভারতের মেঘালয় রাজ্য ঘেষা এলাকা। এখন কয়েক দিন ধরে গুলি আর বোমার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে নাফ নদীর কাছাকাছি অবস্থিত সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে। শুরুর দিকের মতো টানা শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, আওয়াজ আসছে থেমে থেমে। ফলে বাংলাদেশের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য সেন্টমার্টিন্স দ্বীপে পর্যটকদের চলাচল কমে গেছে।

যুদ্ধের সবশেষ পরিস্থিতি : এ মাসের শুরুর দিকে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমানার সাথে লাগোয়া বেশ কয়েকটি সীমান্তরক্ষীদের চৌকি দখলে নিয়েছিল আরাকান আর্মিসহ সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপগুলো। ওই ঘটনার পরই বাংলাদেশে পালিয়ে আসে মিয়ানমারের বিজিপি সদস্যরা। কিছু দিন ধরে দখল হয়ে যাওয়া সেসব চৌকি ও অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিভিন্ন বাহিনী একযোগে রাখাইনের বিভিন্ন স্থানে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলে খবর প্রকাশ করেছে মিয়ানমারের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

থাইল্যান্ডভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরাবতী তাদের খবরে জানিয়েছে যে রাখাইনের রামরি শহরে বিমান, স্থল ও নৌ আক্রমণ জোরদার করেছে সামরিক জান্তা। রাখাইন রাজ্যের উত্তরাংশের রাথেডওং শহরে বিমান ও স্থল হামলার তীব্রতাও বেড়েছে। খবরে বলা হয়েছে, রাথেডওং ও মংডু অঞ্চলে গত কয়েক দিন সামরিক বাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির তীব্র যুদ্ধ হয়েছে।

রাথেডওং অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামে শুক্রবার সকালে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় আগুন লেগে যায় বলে জানাচ্ছে রাখাইন অঞ্চলের খবর প্রকাশ করা ঢাকাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নারিনজারা নিউজ। এর আগের দিন আরাকান আর্মি রাখাইনের দক্ষিণ মংডুতে একটি চেকপোস্ট দখলের উদ্দেশ্যে সেখানে হামলা চালায়। জবাবে মিয়ানমারের বিমানবাহিনী জেট ফাইটার দিয়ে বোমা হামলা চালায় সেসব অঞ্চলে।

অন্য দিকে আরাকান আর্মিও রাখাইন অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক জান্তার পোস্টে হামলা চালিয়ে সেগুলোর দখল নেয়া অব্যাহত রেখেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদ সংস্থা বার্মিজ নিউজ ইন্টারন্যাশনাল, বিএনআই। তাদের খবরে তারা জানাচ্ছে বৃহস্পতিবার রাখাইনের উত্তরাঞ্চলের মিয়েবন শহরের পুরোপুরি দখল নেয় আরাকান আর্মি। ওই শহরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অধীনে থাকা সবগুলো ঘাঁটি, পুলিশ স্টেশন ও অন্যান্য সেনা চৌকির সবগুলো এখন আরাকান আর্মির দখলে। তবে ওই শহরে থাকা মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সদস্য, পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা ১২ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে পালিয়ে যায় বলে বলা হচ্ছে বিএনআইয়ের খবরে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাখাইনের আরো কয়েকটি শহর থেকে অবস্থান সরিয়ে নিচ্ছে বলেও খবর প্রকাশ করছে সংবাদমাধ্যমগুলো। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদেরও সেসব জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়া অব্যাহত রয়েছে বলে জানাচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলো। শুক্রবার রাতে রাখাইনের টাঙ্গুপ জেলার মাত্রই শহর থেকে সামরিক জান্তার সেনাবাহিনী নিজেদের অবস্থান প্রত্যাহার করেছে বলে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশ করেছে নারিনজারা নিউজ।

আরাকান আর্মির দাবির ভিত্তিতে বিএনআই জানাচ্ছে যে এরই মধ্যে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পালেতওয়াসহ পকতও, কিয়াকতও, মিয়েবনসহ ১০টিরও বেশি শহরের পূর্ণ বা আংশিক দখল আরাকান আর্মি নিয়েছে। সেসব অঞ্চলের সেনা ঘাঁটি, পুলিশ স্টেশন ও সেনাবাহিনীর সরঞ্জাম আরাকান আর্মির দখলে রয়েছে বলে খবরে বলা হচ্ছে।

নারিনজারা নিউজের খবরে বলা হচ্ছে ৭ ফেব্রুয়ারির পর থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমার নৌবাহিনীর অন্তত ৯টি নৌযান দখল করেছে আরাকান আর্মি। অন্য দিকে বাংলাদেশের সীমান্তের নিকটবর্তী মংডু, রাথেডওং আর রামরি শহরের দখল নেয়ার জন্য আরাকান আর্মি সেসব এলাকায় সামরিক জান্তা সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলা জোরদার করেছে বলে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশ করেছে ইরাবতী।

তবে মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে একাধিক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, বিদ্রোহীদের হাতে সামরিক বাহিনীর পর্যুদস্ত হওয়ার যেসব খবর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, তা সঠিক নয়।

এ দিকে মিয়ানমারে যে জান্তা সরকার বড় ধরনের সঙ্কটে পড়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় কয়েক দিন আগে তরুণদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়ার নির্দেশে। সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকাগুলো ছেড়ে যে স্থানীয় বাসিন্দারা পালাচ্ছেন, এদের অনেকেই বাংলাদেশের সীমান্তের কাছে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে।

NA 3