কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ১১ দিনেও জমা দেননি চিকিৎসক। তার মৃত্যুর ঘটনায় তাজহাট থানায় একটি মামলা করেছেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বিভূতিভূষণ রায়। ঘটনার পরদিন পেনাল কোডের (১৪৩/১৮/৬/৩৩২/ ৩৩৩/৩৫৩/৩৭৯/৪৩৫/ ৪২৭/৩০২/৩৪) ধারায় মামলাটি করা হয়।
এজাহারে গুলিতে সাঈদ মারা গেছেন এমন কোনও তথ্য নেই। এতে উলেখ করা হয়েছে, ইটপাটকেলের আঘাতে মৃত্যু হয়েছে। আসামি হিসেবে কারও নাম নেই। অজ্ঞাত দুই-তিন হাজার আন্দোলনকারীকে আসামি করা হয়। এ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে গত ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তিনি দায়িত্বরত পুলিশের জন্য হুমকির কারণ ছিলেন না। তারপরও পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। এর কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হয়। তবে পুলিশের প্রাথামিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) উলেখ করা হয়েছে যে, সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হননি। ‘বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দিক থেকে গুলি ছুড়তে থাকে এবং ইটের টুকরো নিক্ষেপ করতে থাকে। এক পর্যায়ে এক শিক্ষার্থীকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখা যায়,’ বলা হয়েছে এফআইআরে।
এতে আরও বলা হয়, সহপাঠীরা সাঈদকে (২৩) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ক্যাম্পাস পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) বিভূতি ভূষণ রায় বিবরণীটি লিখেছেন। গত ১৬ জুলাই তাজহাট থানায় নথিভুক্ত করা এফআইআরে সাঈদ হত্যার ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীসহ অজ্ঞাত দুই থেকে তিন হাজার অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
ভিডিও ফুটেজের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিভূতি ভূষণ বলেন, ‘আমি মাত্র মামলা দায়ের করেছি। তদন্তকারী কর্মকর্তা তথ্য যাচাই করবেন।’
মামলার এজাহারে উলেখ করা হয়েছে, ‘পরস্পর যোগসাজশে বেআইনি জনতা সাধারণ/মারাত্মক অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করে গুরুতর জখম, চুরি, ভাঙচুর, ক্ষতিসাধন, অগ্নিসংযোগ ও নিরীহ ছাত্রকে হত্যা করার মতো অপরাধ করেছে। উচ্ছৃঙ্খল দুই-তিন হাজার আন্দোলনকারী ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্ত, তাদের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির সমর্থিত নেতা-কর্মীও রয়েছে। পুলিশ সদস্যদের মারপিট করে মারাত্মক আহত করে তারা। সড়ক অবরোধে থাকা উচ্ছৃঙ্খল ছাত্রদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন সুবিধাভোগী রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলনরত দুর্বৃত্ত বিভিন্ন দিক থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ও তাদের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশও এপিসি গাড়ির মধ্য থেকে কং/১১৮৬ সোহেল নামীয় সরকারি ইস্যুকৃত শটগান থেকে ১৬৯ রাউন্ড রাবার বুলেট ফায়ার করে। সংঘর্ষে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিভিন্ন দিক থেকে আন্দোলনকারীদের ছোঁড়া গোলাগুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের একপর্যায়ে এক শিক্ষার্থীকে রাস্তায় পড়ে যেতে দেখা যায়। তখন তার সহপাঠীরা তাকে ধরাধরি করে চিকিৎসার জন্য বিকেল ৩টা ৫ মিনিটের দিকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মৃত ছাত্রের নাম আবু সাঈদ (২৩), বাবা মকবুল হোসেন, গ্রাম জাফরপাড়া বাবনপুর, থানা পীরগঞ্জ, জেলা রংপুর।’
তবে এই এজাহার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, নিজেদের দোষ ঢাকতে বিক্ষোভকারীদের ওপর দোষ চাপাতে চাইছে পুলিশ। আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করলেও এজাহারে ইটপাটকেলের আঘাতের কথা উলেখ করেছে। প্রকাশ্যে বুকে গুলির যে ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারা বিশ্ব দেখলো, সেটি কী তাহলে মিথ্যা। তার পুরো শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। এ ছাড়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, ভিডিও দেখলে তার প্রমাণ মিলবে। এতে গুলি বর্ষণকারী পুলিশ সদস্য এবং গুলি করার নির্দেশদাতার নাম উলেখ করা হয়নি। এটি সাজানো এজাহার।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘আমরা ভিডিওতে দেখেছি আবু সাঈদকে টার্গেট করে গুলি করেছে পুলিশ। আমি তার লাশ দেখেছি। সারা শরীরে অসংখ্য গুলি আর রাবার বুলেটের চিহ্ন ছিল। ১১ দিন অতিবাহিত হলেও অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য ও নির্দেশদাতার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নেওয়া আশ্চর্যজনক। এ নিয়ে বিস্মিত হচ্ছি। হত্যায় জড়িত পুলিশ সদস্যের বিচার না হলে পুলিশ বাহিনী ও সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তবে আমরা চাই, দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় আনা হোক।’
সাঈদকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাকাউন্টিং এ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষক ওমর ফারুক। তিনি বলেন, ‘আমরা এর বিচার চাই। তদন্ত করে দোষী পুলিশ সদস্যদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
গুলিবিদ্ধ হয়ে সাঈদ মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রংপুর মহানগর শাখার আহŸায়ক সাজু বাসফোর। তিনি বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ সাঈদকে আমিসহ কয়েকজন মিলে হাসপাতালে নিয়ে এলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’
দু’টি ভিডিও যাচাই করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সেখানে দেখা যাচ্ছে, অন্তত দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা রাস্তার বিপরীত পাশ থেকে তাকে লক্ষ্য করে ১২-গেজ শটগান থেকে সরাসরি গুলি ছোঁড়েন। সে সময় সাঈদ তার বুক চেপে ধরে এবং পুলিশ কর্মকর্তা কমপক্ষে আরও দু’বার গুলি চালান।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে সাঈদ ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ভৌগলিক অবস্থান শনাক্ত করে দেখতে পায় যে, গুলি চালানোর সময় তারা প্রায় ১৫ মিটার দূরত্বে ছিল।
গত ১৮ জুলাই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলে, সাঈদ পুলিশের জন্য দৃশ্যত কোনো শারীরিক হুমকির কারণ ছিলেন না। সাঈদের মৃত্যু সনদে উলেখ করা হয়েছে, তাকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল। সাঈদের ওপর পুলিশের হামলা ছিল বেপরোয়া ও বিনা উসকানিতে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান রাজিবুল ইসলাম জানান, ‘ছররা গুলি আঘাতে অভ্যন্তরীণ রক্ত ক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।’ তবে এর বেশি তথ্য জানাতে রাজি হননি তিনি। রাজিবুল বলেন, শিগগির ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে।
এফআইআরের ব্যাপারে জানতে চাইলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (অপরাধ) আবু মারুফ হোসেন বলেন, আন্দোলন চলাকালে জামায়াত-শিবির ও বিএনপি নেতা-কর্মী এবং অছাত্র অনেকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। তদন্ত শেষ হলেই পুরো বিষয় পরিষ্কার হবে।
বেরোবির তদন্ত কমিটি গঠন : সাঈদ নিহতের ঘটনায় ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মতিউর রহমানকে আহŸায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। রসায়ন বিভাগের প্রফেসর ড. বিজন মোহন চাকীকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুর রহমানকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে কমিটির আহŸায়ক মতিউর রহমান বলেন, ‘এখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। তারপরও তদন্তকাজ শুরু করেছি আমরা। ইতোমধ্যে সেদিনের ঘটনার ভিডিও এবং সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে কমিটির সদস্যদের নিয়ে আরও তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’
পুলিশের চার সদস্যের তদন্ত কমিটি : একই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোঃ সায়ফুজ্জামান ফারুকীকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনার পরদিন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত হবে। এসবের মধ্যে আছে পুলিশের ওপর হামলা, ঘটনার কারণ ও সাঈদের মারা যাওয়ার বিষয়। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।’
পুলিশের করা মামলার এজাহারে উলেখ করা হয়েছে আবু সাঈদ দুইপক্ষের ইটপাটকেলের আঘাতে মারা গেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান বলেন, ‘পুলিশের কেউ গুলি করে থাকলে প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। সেদিনের ঘটনার ভিডিও এবং সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর জানা যাবে, আসলে কী ঘটেছে। এরপর দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
১১ দিনেও দেওয়া হয়নি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন : সাঈদের লাশের ময়নাতদন্ত করেছেন রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ রাজিকুল ইসলাম। ১১ দিনেও প্রতিবেদন না দেওয়ার কারণ জানতে একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ করেননি তিনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রংপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাঃ শাহ মোঃ সারোয়ার জাহান বলেন, ‘ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ছুটিতে আছেন। সোমবার কাজে যোগ দেবেন। আশা করছি, কাজে যোগ দেওয়ার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন তিনি।’
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৬ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তিনি পীরগঞ্জ উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের বাবনপুর গ্রামের দিনমজুর মকবুল হোসেন ও মনোয়ারা বেগম দম্পতির ছেলে।
সাঈদের বাবা-মাকে ঢাকায় : স্বজন ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার বিকালে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসানসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সাঈদের বাড়িতে এসে তার বাবা-মাকে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার জন্য যেতে বলেন। শনিবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, মা মনোয়ারা বেগম, ভাই আবু হোসেন, বোন সুমি আখতার, ভাবি সাবিনা আকতার ঢাকায় গেছেন।
সূত্র : ডেইলী স্টার, সমকাল, যায়যায় দিন, বাংলা ট্রিবিউন, আর টিভি, ঢাকা পোষ্ট, প্রতিদিনের বাংলাদেশ অনলাইন।
