বছরজুড়েই ‘বন্ধ-চালুর খেলা’ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে - জনবার্তা
ঢাকা, রবিবার, ২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বছরজুড়েই ‘বন্ধ-চালুর খেলা’ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে

জনবার্তা প্রতিবেদন
ডিসেম্বর ২৪, ২০২৩ ১:১৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলতি বছর বেশ কয়েকবার বন্ধ হয়ে যায় বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। গত বছরের ডিসেম্বরে একটি ইউনিট উৎপাদনে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় বন্ধ হয়ে যায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ মালিকানায় নির্মিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুই ইউনিটের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১০ বার বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যান্ত্রিক ত্রুটি ও কয়লা সংকটের কারণে এতো বার উৎপাদন বন্ধ হয়েছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে।

শুধুমাত্র চলতি বছরের জুলাই মাসেই বন্ধ হয় তিনবার। এতে ব্যাহত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন। এর প্রভাব পড়ে জাতীয় গ্রিডে। আলোচিত ও সমালোচিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির এমন ‘বন্ধ-চালুর’ খেলা আর কতদিন চলবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

২০১০ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি পিডিবি ও ভারতের এনটিপিসির মধ্যে এ নিয়ে একটি চুক্তি হয়। গঠন হয় বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল)। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশ ঋণ হিসেবে দেয় ভারতের এক্সিম ব্যাংক। ঠিকাদার সে দেশের প্রতিষ্ঠান ‘ভেল’।

২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরুর কথা থাকলেও তা এক বছর বিলম্ব হয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল কেন্দ্রটির। সুন্দরবনের কাছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে শুরু থেকেই পরিবেশবাদীরা আপত্তি জানালেও তাতে গুরুত্ব দেয়নি সরকার।

এমন আপত্তির মধ্যেই গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। আর দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু হয় গত ২৪ অক্টোবর ভোরে।

প্রথম ইউনিটটি চালুর প্রায় এক মাস পর ১৪ জানুয়ারি কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। মূলত ডলার-সংকটে ঋণপত্র খুলতে না পারায় কয়লা আমদানি নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হয়। এক মাস পর ফের উৎপাদনে ফেরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

১৫ এপ্রিল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। চার দিন পর এটি আবার চালু হয়। ডলা সংকটের কারণে কয়লা আমদানি করতে না পারায় ২৪ এপ্রিল আবার উৎপাদন বন্ধ হয়। ২৩ দিন পর ১৬ মে রাতে কেন্দ্রটিতে আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়।

গত ৩০ জুন রাতে জেনারেটর ইউনিটের প্রোটেকশনে ত্রুটির কারণে উৎপাদন আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ত্রুটি সারিয়ে ১০ দিন পর অর্থাৎ গত ১০ জুলাই সন্ধ্যায় উৎপাদনে ফেরে কেন্দ্রটি।

এর চার দিনের মাথায় ১৩ জুলাই রাতে আবার কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে নয় ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ থাকে। ১৬ জুলাই দুপুরে গ্ল্যান্ডফিলে লিকেজের কারণে আবার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ সেপ্টেম্বর ত্রুটি দেখা দেয় ছাই নির্গমন প্রক্রিয়ায়। ৫ নভেম্বর কারিগরি ত্রুটির কারণে আবারও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর সকালে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের কারিগরি সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। মাঝখানে কয়লা সংকটের কারণে আরও একদিন উৎপাদন বন্ধ থাকে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, নানা সংকটের কারণে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার পর সক্ষমতার চেয়ে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে রামপালের দুই ইউনিট। ইউনিট দুটির সর্বোচ্চ সক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট হলেও দৈনিক গড়ে ৫৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

বিআইএফপিসিএল প্রকল্প পরিচালক সুভাষ চন্দ্র পাণ্ডে সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘টিউব দীর্ঘসময় গুদামে পড়ে থাকায় সমস্যা হচ্ছে। এমন সমস্যা ভারতের বিভিন্ন কেন্দ্রেও হয়েছে। কয়েক বছর পর এটি থাকবে না।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের ভুল নীতির কারণে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। যখন সারা বিশ্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন শত বাধা সত্ত্বেও সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে শুরু থেকেই সরকার মিথ্যাচার করে আসছে। সরকার যে মিথ্যাচর করেছে তার প্রমাণ হচ্ছে বারবার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়া। তারা (সরকার) বলেছে এটা হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি। এখন দেখা যাচ্ছে কয়েকদিন পরপর কারখানায় সমস্যা হচ্ছে।’

আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘মূল বিষয় হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আসলে রামপাল করা হয় নাই। রামপাল করাই হয়েছে ভারতকে খুশি করার জন্য। যার কারণে মেশিনপত্রও ঠিক থাকে না, কয়লাও ঠিক থাকে না। জনগণের টাকার অপচয় করা হয়েছে। এটা থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে এটা বন্ধ করে দিয়ে সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি চালু করা।’