নির্বাচন পর্যবেক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে, কমেছে গ্রহণযোগ্যতা - জনবার্তা
ঢাকা, রবিবার, ২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নির্বাচন পর্যবেক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে, কমেছে গ্রহণযোগ্যতা

জনবার্তা প্রতিবেদন
ডিসেম্বর ১৮, ২০২৩ ১২:০১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যা বাড়লেও সর্বজন গ্রহণযোগ্যদের পরিমাণ কমেছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক অনুপস্থিত এবারের নির্বাচনে। এতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অস্বস্তি থাকলেও পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ছাড়া গতি নেই বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেশাদারত্বের সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনগুলো পর্যবেক্ষকের কাজটি করেন যেমন এনডিআই, আইআরআই, কমনওয়েলথ বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তারা এবার প্রকৃত অর্থে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন না। তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ না করে মূল্যায়নের জন্য লোক পাঠাচ্ছে বা প্রাক-মূল্যায়ন মিশন পাঠাচ্ছে। যারা আসছেন তারা একেবারেই অন্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ লোক। তারা পর্যবেক্ষক নয়। আর অন্য বিদেশি যারা পর্যবেক্ষকের নাম দিয়ে আসছে তারা মূলত এমেচার (আনাড়ি) লোক।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, তারা (এনডিআই, আইআরআই, কমনওয়েলথ বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন) পেশাদারত্বের সঙ্গে যে কাজটা শিখেছে, করেছে এবং করতো- সেটা করার মতো লোক বা প্রতিষ্ঠান কিন্তু এবার আসছে না। আসলেও তারা লিমিটে ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করবে। কিন্তু পর্যবেক্ষণ করবে না। কারণ পর্যবেক্ষণ করা মানে স্বীকৃতি দেওয়া। আর তারা কৌশলগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকছে।

দেশি ও বিদেশি কতজন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে এ বিষয়ে ইসির তথ্য বলছে, দুই ধাপে মোট ৯৬টি দেশি সংস্থাকে নিবন্ধন দিয়েছে ইসি। প্রথম দফায় ৬৭টি, দ্বিতীয় ধাপে দেওয়া হয় ২৯টি সংস্থাকে। এসব সংস্থার কতজন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে মাঠে থাকবেন সে তথ্য এখনও জানানো হয়নি। আর বিভিন্ন দেশ, সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে আবেদন নেওয়ার সময় শেষ হয়েছে গতকাল শনিবার। সব মিলিয়ে ২২৭ জনের মধ্যে ১৫৬ জন পর্যবেক্ষক ও ৭১ জন সাংবাদিক আবেদন করেছেন। এরমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও কেউ কেউ পর্যবেক্ষণের জন্য আবেদন করেছেন।

অন্যদিকে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওআইসি ও কমনওয়েলথ থেকে আমন্ত্রিত এবং অন্যান্য বিদেশি পর্যবেক্ষক ছিলেন ৩৮ জন। এর বাইরে বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনের কর্মকর্তা (বিদেশি) ছিলেন ৬৪ জন। বিভিন্ন দূতাবাস/হাইকমিশন বা বিদেশি সংস্থায় কর্মরত ৬১ কর্মকর্তাও (সবাই বাংলাদেশি) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। অন্যদিকে দেশি ৮১টি পর্যবেক্ষক সংস্থার ২৫ হাজার ৯০০ জন গত নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণের ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালের ১২ জুলাই জাতিসংঘের কমিটি মানবাধিকার, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন সংক্রান্ত একটি ঘোষণায় ২৫টি বিষয়কে গ্রহণ করা হয়। আর যুক্তরাষ্টে্রর ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনন্সিটিটিউট (এনডিআই) বলছে, কোনো নির্বাচনী প্রক্রিয়া শতভাগ সঠিক নয়। তারপরেও কিছু সর্বজনীন বিষয় আছে যার মাধ্যমে বোঝা যায় নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে। এগুলো হচ্ছে— অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন, নির্বিঘ্ন প্রচারণা, স্বাধীন পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যমে সমান সুযোগ, স্বাধীন সংস্থা, অন্যান্য বিষয় (যেমন—ভয়ভীতি, অর্থের প্রলোভন, প্রতিহিংসার শিকার, ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা, এজেন্টের সামনে ভোট গণনা ইত্যাদি) থাকা।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘পর্যবেক্ষকদের তালিকা দেখেই বোঝা যায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চিত্র। ইইউসহ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক সংস্থাই এবার (পূর্ণাঙ্গভাবে) এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে না।’

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদ (জানিপপ) এর চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে তো জোর করে আনা যায় না। তারা মনে করেছে, এবারের নির্বাচন অংশগ্রহণ হচ্ছে না, তাই তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। পরিমাণ বাড়লেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা হয় না। নির্বাচন আমাদের মতো করে ফেলতে পারি। কিন্তু ভবিষ্যতে প্রশ্ন তোলার জন্য যা যা কৌশল সেগুলো আন্তর্জাতিক মহল নিজের আস্তিনের নিচে রেখে দিচ্ছে। লজিক্যালি গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থেকে যাবে।’

দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের তালিকা দেখলেই সহজে বোঝা যায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। তাদের মতে, ৯৬টি দেশি সংস্থার বেশ কয়েকটি সংস্থা নামসর্বস্ব ও ভুঁইফোড়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা বিদেশি কয়েকজন নাগরিককে পর্যবেক্ষক হিসেবে এনে বিতর্ক তৈরি করেছিল। ওই সংস্থার মহাসচিব আবেদ আলীর আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম। তারা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর্যবেক্ষণের জন্য নিবন্ধন পেয়ে। শুধু তাই নয় কয়েকজন বিদেশি নাগরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আনার জন্য আবেদন করেছে। আবার ইসি চারটি সংস্থা ও ৩৪টি দেশের নির্বাচন কমিশনের ১১৪ জনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এদের বিমান ভাড়া ছাড়া সব স্থানীয় ব্যয় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন বহন করবে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক মিশন পাঠাবে না বলে আগেই জানিয়েছে। তবে তাদের একটি বিশেষজ্ঞ দল পর্যবেক্ষণে থাকবে। চার সদস্যের দলটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশে এসেছে। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাদের ৮০০ জনের প্রতিনিধি দল তিন ধাপে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছিল। ২০১৮ ও ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ ও দশম সংসদ নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। পরে এ দুটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছিল তারা। কমনওয়েললথ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটও (এনডিআই) নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহ দেখালেও পরিপূর্ণ প্রতিনিধি দল পাঠাবে না জানিয়েছে।

ইসি সূত্র বলছে, ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে কর্মরত বিদেশি নাগরিকেরাও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। এবারও সে ধরনের আবেদন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ২৯ কর্মকর্তাকে (তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও রয়েছেন) বিদেশি পর্যবেক্ষক হিসেবে অ্যাক্রিডিটেশন (অনুমতিপত্র) চেয়েছেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আফ্রিকান ইলেকটোরাল অ্যালায়েন্স (এইএ) থেকে ১১ জন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার জন্য আবেদন করেছেন। যাদের সবাই উগান্ডার নাগরিক।

ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো. শরিফুল আলম জানান, ‘বার্তা সংস্থা এজেন্সি ফ্রান্স প্রেসের ১২ জন, আবুধাবি থেকে একজন, ভারতের এনডিটিভির দুজন, সাউথ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ফোরামের চারজন, ব্রিটিশ হাইকমিশনের একজন, ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্টেরিয়ান কংগ্রেসের তিনজন, সুইডিশ রেডিও থেকে একজন, জাপানের একজন, জার্মানির দুইজন (একজন সাংবাদিক, আরেকজন পর্যবেক্ষক), ইতালি থেকে একজন ও অষ্ট্রেলিয়ার দূতাবাসের একজনসহ বেশ কয়েকজন ভোট পর্যবেক্ষণ করতে আবেদন করেছেন।

নির্বাচনী তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে মাত্র চারজন বিদেশি এবং স্থানীয় ৩৫টি সংস্থার ৮ হাজার ৮৭৪ জন ভোট পর্যবেক্ষণ করেন। ২০০৮ সালে ৫৯৩ জন বিদেশি এবং ১ লাখ ৫৯ হাজার ১১৩ জন দেশি ভোট পর্যবেক্ষণ করেন। ২০০১ সালে ভোট পর্যবেক্ষণে আসেন ২২৫ জন বিদেশি এবং ২ লাখ ১৮ হাজার জন দেশি পর্যবেক্ষক ভোট পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯৯৬ সালে প্রায় ৪০ হাজার দেশি এবং ২৬৫ জন বিদেশি ও ১৯৯১ সালে ৩০ হাজার দেশি ও ৫৯ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ভোট পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।
সূত্র : দেশ রূপান্তর