কেয়ামতের সবগুলো ছোট আলামত এখনও প্রকাশিত হয়নি। যদিও অনেকে দাবি করেন যে, ছোট আলামতের আর কিছু বাকি নেই। এই ধারণা ভুল। বরং ছোট বেশ কিছু আলামত এখনও প্রকাশিত হওয়া বাকি রয়ে গেছে। বলা বাহুল্য, ছোট সব আলামত প্রকাশিত হওয়া অবধি রাতারাতি বড় আলামতগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করবে না। আর ইমাম মাহদি হচ্ছেন ছোট ও বড় আলামতের মধ্যে সেতুবন্ধন। কারণ, তাঁর সময়েই ঈসা (আ.)-এর আগমন, দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ থেকে শুরু করে অনেক কিছুই ঘটবে। আর বড় আলামতগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ছেঁড়া তাসবিহ দানার মতো একের পর এক সবগুলোই প্রকাশিত হয়ে যাবে।
এখানে ছোট আলামতগুলো নিয়ে কিছু সহিহ বর্ণনা তুলে ধরা হলো। হাদিসগুলো থেকেই পাঠকরা বুঝতে পারবেন যে, কোন কোন আলামত এখনও প্রকাশিত হয়নি।
১. আব্দুর রহমান ইবনু গানাম আশআরি (রহ) বর্ণনা করেন- حَدَّثَنِي أَبُو عَامِرٍ أَوْ أَبُو مَالِكٍ الْأَشْعَرِيُّ، وَاللَّهِ مَا كَذَبَنِي: سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: ” لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ، يَسْتَحِلُّونَ الحِرَ وَالحَرِيرَ، وَالخَمْرَ وَالمَعَازِفَ، وَلَيَنْزِلَنَّ أَقْوَامٌ إِلَى جَنْبِ عَلَمٍ، يَرُوحُ عَلَيْهِمْ بِسَارِحَةٍ لَهُمْ، يَأْتِيهِمْ – يَعْنِي الفَقِيرَ – لِحَاجَةٍ فَيَقُولُونَ: ارْجِعْ إِلَيْنَا غَدًا، فَيُبَيِّتُهُمُ اللَّهُ، وَيَضَعُ العَلَمَ، وَيَمْسَخُ آخَرِينَ قِرَدَةً وَخَنَازِيرَ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ “.
‘আমার নিকট আবু আমির কিংবা আবু মালিক আশআরি বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম, তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী (স.)-কে বলতে শুনেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমি কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকেল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোনো অভাব নিয়ে ফকির আসলে তারা বলবে, আগামীদিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধসিয়ে দেবেন। আর বাকি লোকদেরকে তিনি কেয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। (সহিহ বুখারি: ৫৫৯০)
২. আনাস (রা.) বর্ণনা করেন- أُحَدِّثَنَّكُمْ حَدِيثًا لاَ يُحَدِّثُكُمْ أَحَدٌ بَعْدِي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ “ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ يَقِلَّ الْعِلْمُ، وَيَظْهَرَ الْجَهْلُ، وَيَظْهَرَ الزِّنَا، وَتَكْثُرَ النِّسَاءُ وَيَقِلَّ الرِّجَالُ، حَتَّى يَكُونَ لِخَمْسِينَ امْرَأَةً الْقَيِّمُ الْوَاحِدُ.
‘আমি তোমাদের সামনে এমন একটি হাদিস বর্ণনা করছি, যা আমার পর তোমাদের নিকট আর কেউ বর্ণনা করবে না। আমি আল্লাহর রাসুল (স.)-কে বলতে শুনেছি, কেয়ামতের কিছু আলামত হলো—‘ইলম হ্রাস পাবে, অজ্ঞতার প্রসার ঘটবে, ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়বে, নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে; এমনকি প্রতি ৫০ জন নারীর জন্য মাত্র একজন পুরুষ হবে পরিচালক। (সহিহ বুখারি: ৮১; সহিহ মুসলিম: ২৬৭১)
এ বিষয়ে অন্য হাদিসে আবু মুসা আশআরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- لَيَأْتِيَنَّ عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ يَطُوفُ الرَّجُلُ فِيهِ بِالصَّدَقَةِ مِنَ الذَّهَبِ ثُمَّ لاَ يَجِدُ أَحَدًا يَأْخُذُهَا مِنْهُ، وَيُرَى الرَّجُلُ الْوَاحِدُ يَتْبَعُهُ أَرْبَعُونَ امْرَأَةً، يَلُذْنَ بِهِ مِنْ قِلَّةِ الرِّجَالِ وَكَثْرَةِ النِّسَاءِ
‘মানুষের ওপর অবশ্যই এমন এক সময় আসবে, যখন লোকেরা সদকার স্বর্ণ নিয়ে ঘুরে বেড়াবে; কিন্তু একজন গ্রহীতাও পাবে না। পুরুষের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার কারণে এবং নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ৪০ জন নারী একজন পুরুষের অধীনে থাকবে এবং তার আশ্রয় গ্রহণ করবে।’ (সহিহ বুখারি: ১৪১৪; সহিহ মুসলিম: ১০১২)
৩. আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন; রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَخْرُجَ رَجُلٌ مِنْ قَحْطَانَ يَسُوقُ النَّاسَ بِعَصَاهُ.
‘কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না কাহতান গোত্র থেকে এমন এক লোক বের হবে, যে মানুষকে লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে নেবে। (সহিহ বুখারি: ৭১১৭; সহিহ মুসলিম: ২৯১০)
অন্য বর্ণনায় এসেছে- لَا تَذْهَبُ الأَيَّامُ وَاللَّيَالِي حَتَّى يَمْلِكَ رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ الْجَهْجَاهُ ‘রাত দিন শেষ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না জাহজাহ নামে কোনো লোক শাসনকর্তা হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৯১১)
৪. আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন; রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- يُوشِكُ الْفُرَاتُ أَنْ يَحْسِرَ عَنْ كَنْزٍ مِنْ ذَهَبٍ فَمَنْ حَضَرَهُ فَلاَ يَأْخُذْ مِنْهُ شَيْئًا
‘নিকট ভবিষ্যতে ফোরাত নদী তার ভূগর্ভস্থ সোনার খনি বের করে দেবে। সে সময় যারা উপস্থিত থাকবে, তারা যেন তা থেকে কিছুই গ্রহণ না করে।’ (সহিহ বুখারি: ৭১১৯; সহিহ মুসলিম: ২৮৯৪, ২৮৯৫)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, يَحْسِرُ عَنْ جَبَلٍ مِنْ ذَهَبٍ অর্থাৎ ‘স্বর্ণের পর্বত বের করে দেবে।’ (প্রাগুক্ত)
৫. আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন; রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُبْعَثَ دَجَّالُوْنَ كَذَّابُوْنَ قَرِيْبًا مِنْ ثَلَاثِيْنَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم
‘কেয়ামত সংঘটিত হবে না, যে পর্যন্ত প্রায় ৩০ জন মিথ্যাচারী দাজ্জালের আবির্ভাব না হবে। এরা সবাই নিজেকে আল্লাহর রাসুল বলে দাবি করবে। (সহিহ বুখারি: ৩৬০৯)
উল্লেখিত নিচের হাদিস অনুযায়ী, কেয়ামতের আগে ৩০ জন মিথ্যা নবুয়তের দাবি করবে। যদিও নববি যুগ থেকে এ পর্যন্ত বহু ভণ্ড লোক মিথ্যা নবুয়তের দাবি করেছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (স.) যেই মহা প্রতারক ৩০ জনের ব্যাপারে উম্মাহকে জানিয়েছেন, নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই যে সবগুলো ঘটে গেছে। তবে দাজ্জাল শব্দ এবং হাদিসের প্রেক্ষাপট থেকে অনুমেয়, এই ৩০ জনের ফিতনা হবে অনেক বিস্তৃত। যেমনটা মুসায়লামা কাজজাব থেকে গোলাম আহমদ কাদিয়ানি প্রমুখের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
এ ধরনের আরও অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে, যেগুলো অদ্যাবধি প্রকাশিত হয়েছে বলে সুনিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই। সুতরাং যারা দাবি করে, কেয়ামতের ছোট সব আলামত প্রকাশিত হয়ে গেছে, তাদের দাবি বাস্তবসম্মত নয়। হ্যাঁ, এর অধিকাংশ যে প্রকাশিত হয়ে গেছে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যেমনটি হাফিজ ইবনু হাজার রহ. ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে (১৩/৮৫) লিখেছেন, ‘বায়হাকি ও অন্যান্যরা বলেছেন, কেয়ামতের কিছু নিদর্শন হলো ছোট। এর অধিকাংশ প্রকাশিত হয়ে গেছে। আর এর কিছু নিদর্শন বড়, যা শীঘ্রই প্রকাশিত হবে।’
