রপ্তানিতে পেঁয়াজে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ভারত সরকার। শনিবার এ ঘোষণা আসার পরই বাংলাদেশের বাজারে হু হু করে বাড়তে শুরু করে পেঁয়াজের দাম। খুলনার বাজারে মাত্র একদিনের ব্যবধানে গতকাল রবিবার এই নিত্যপণ্যটির দাম কেজিপ্রতি ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে সাধারণ ভোক্তারা বিড়ম্বনায় পড়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শুল্ক আরোপের ফলে রাতারাতি দাম বৃদ্ধির কারণ নেই। কারণ এলসি খোলা, আমদানি করা পেঁয়াজ দেশে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। মূলতঃ ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কারসাজি করছে। তারা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, রবিবার ভারতীয় পেঁয়াজ ৬৫-৭০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৯০ টাকা কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে। অথচ একদিন আগে শনিবার (১৯ আগস্ট) দেশি পেঁয়াজ ৭৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। আর ভারতীয় পেঁয়াজ ৫৫-৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছিল। অর্থাৎ একদিনের বাজার ও আকার ভেদে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
নগরীর ময়লাপোতা সান্ধ্য বাজারের ব্যবসায়ী সুজন ও কাওসার বলেন, আড়তে পেঁয়াজের কোন ঘাটতি নেই। তবুও পেঁয়াজ বেশি দামে কিনতে হয়েছে। ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশিতে পেঁয়াজ কিনেছি। ফলে বাড়তি দামেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে।
এদিকে পেঁয়াজ রপ্তানিতে ভারতের শুল্ক আরোপের খবরের পর দেশের বন্দর এলাকায়ও পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী। শুল্ক আরোপের পর নতুন দামে পেঁয়াজ আমদানি শুরু না হলেও যশোরে একদিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি পেঁয়াজে দাম বেড়েছে ১৫ টাকা পর্যন্ত। আবার দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জেও বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। পেঁয়াজ রপ্তানিতে ভারতের ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের খবরে রবিবার সকাল থেকে খাতুনগঞ্জের আড়তে কেজি প্রতি পেঁয়াজে দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা।
তবে ক্রেতারা বলছেন, শুল্ক আরোপের খবরে দেশের ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ৪০ শতাংশ শুল্কসহ এলসি করা পেঁয়াজ এখনো দেশে আসেনি। কিন্তু ভারত সরকারের এ ঘোষণার পরই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা আগের দামে কেনা পেঁয়াজের দাম নতুন করে বাড়িয়ে দিয়েছেন। সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ করা হলেও ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে সরবরাহ কম থাকায় পেঁয়াজের দাম বাড়ছে।
ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম যেন হঠাৎ বেড়ে না যায়, সেজন্য দেশটি এ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ রবিবার থেকে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়ে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে।
আমদানিকারকরা জানান, পেঁয়াজ আমদানিতে বাংলাদেশকে এতোদিন কোনো শুল্ক দিতে হতো না। ১৯ আগস্ট পেঁয়াজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় ভারত। দেশটির বাজারে পেঁয়াজের দামের নাগাল টানতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানানো হয়। এটি ২০ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়ে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। সর্বশেষ ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে ৩৮ থেকে ৪৬ টাকা খরচ হতো। শুল্ক আরোপের পর প্রতি কেজি পেয়াজের আমদানি খরচ ৫৩ থেকে ৬৫ টাকায় পৌঁছাবে।
নগরীর দৌলতপুর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভারতীয় পেঁয়াজ কেজি প্রতি ৬০-৬২ টাকা ও দেশি পেঁয়াজ ৮০-৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যা গেল সপ্তাহে ৫০-৫৬ টাকায় বিক্রি হয়েছিলো। নগরীর বয়রা বাজারেও পেয়াজ ৬০-৮৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতারা বলছেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। আমদানি শুল্কের অজুহাতে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ মজুদ হতে পারে। ফলে দাম আবারও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোঃ ইব্রাহীম হোসেন বলেন, আমরা শুনেছি। এ বিষয়টি আমাদের নজরদারীতে রয়েছে।
এ বিষয়ে কনজ্যুমার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, যে কোনো অজুহাতে পণ্যমূল্য বাড়ানোই ব্যবসায়ীদের প্রবণতা। পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। কারণ, বাড়তি শুল্কায়নের পেঁয়াজ এখনো দেশে আসেনি। অথচ খবর শুনেই সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানো হলো। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর হতে হবে। সরকারের মাঠ প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের কোনো সংকট নেই। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে। পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা ২৮ লাখ টন অতিক্রম করে যাচ্ছে।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৩৫ লাখ টন। তার আগের অর্থবছরে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল ৩৪ লাখ টন। এরও আগের ২০২০-২১ অর্থবছরে এ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৬ লাখ টন। অর্থাৎ, গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে।
কৃষিখাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত কয়েক বছরে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি মাঝে মধ্যেই অনিশ্চয়তার পড়ায় বাংলাদেশে পেঁয়াজ চাষে আরও বেশি জোর দেওয়া হয়। কয়েক বছর ধরেই পেঁয়াজের ভালো দাম পাওয়ায় দেশের কৃষকেরা পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকেছেন। তাতে যেমন উৎপাদন বাড়ছে, ভোক্তার চাহিদাও মিটছে। এর ফলে সা¤প্রতিক বছরগুলোতে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি কমতে শুরু করেছে। তবে ব্যবসায়ীদের মনোভাবের পরিবর্তন হয়নি। পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্তে¡ও ব্যবসায়ীরা শুল্কায়নের খবরে অনৈতিকভাবে দাম বাড়াচ্ছেন।
