খুলনার নিখোঁজ চার চিকিৎসককে ফিরে পেতে পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। সোমবার (২১ আগস্ট) দুপুরে খুলনার বিএমএ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাদের বাড়ি তল্লাশির নামে তছনছ করার অভিযোগ করা হয়। সিআইডি পরিচয়ে এ অভিযান চালানো হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে সিআইডি অফিস থেকে তারা কোনও তথ্য জানতে পারছেন না।
সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ ডা. নাজিয়া মেহজাবিন তিশার মা নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘বি কে রায় রোডের বাসায় ১৮ আগস্ট সকালে সিআইডি পরিচয়ে তিন জন পুরুষ এবং একজন নারী আসেন। তারা তিশাকে খুঁজতে থাকেন। তিশাকে পেয়ে তারা তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। তিশা কারণ জানতে চাইলে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে টেনেহিঁচড়ে নেওয়ার কথা বলেন। এ সময় তিশা ওয়ারেন্ট দেখতে চাইলে তারা আরও রূঢ় আচরণ করেন। এরপর ফোন ও ল্যাপটপসহ তিশাকে নিয়ে যান।’
তিনি জানান, তিশা খুলনা মেডিক্যাল কলেজের কে ২৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী। বর্তমানে অনারারি মেডিক্যাল অফিসার।
নিখোঁজ ডা. মুসতাহিন হাসান লামিয়ার মা ফেরদৌস আক্তার বলেন, ‘১৮ আগস্ট সকালে সিআইডি পরিচয়ে তিন জন পুরুষ এবং দুই জন নারী তাদের টিবি বাউন্ডারি রোডের বাসায় আসেন এবং বাসায় জোর করে প্রবেশ করে সবার কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে নেন। বাসায় সবকিছু তছনছ করে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেন। এ সময় লামিয়া সিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে বাসায় আসে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে সিআইডি পরিচয়ধারীরা গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। এ অবস্থায় লামিয়ার তিন মাসের শিশুসন্তান কান্নাকাটি করছিল। এ রকম পরিবেশে লামিয়াকে গাড়িতে তুলতে তুলতে সিআইডি পরিচয়ধারীরা বলছিলেন ডা. তারিমের নাম বলতে। তখন লামিয়া বলে, “ডা. তারিমের সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।” তখন তারা বলে, “ডা. তারিমের নাম বললে ছেড়ে দেবো।” কিন্তু লামিয়া ওই নাম বলতে অস্বীকার করে। এরপর লামিয়াকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।’ তিনি জানান, লামিয়া থ্রি ডক্টরস কোচিংয়ে ১৫-১৬ ব্যাচে শিক্ষার্থী ছিলেন।
নিখোঁজ ডা. লুইস সৌরভের মা ম্যাকুলেট সরকার বলেন, ‘১৮ আগস্ট ভোর রাতে সিআইডি পরিচয়ে একটি দল রূপসার শচিনপাড়ার বাড়িতে এসে ডাকাডাকি করে। তারা জানান, মেডিক্যাল প্রশ্নপত্র ফাঁসের অপরাধে লুইসকে গ্রেফতার করতে এসেছেন। কিন্তু গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখাতে পারেননি। আমি তাদের বলি, ছেলে তার মামার বাড়িতে আছে। তখন তারা লুইসের বাবাকে সঙ্গে নিয়ে তার মামার বাসায় যান। সেখান থেকে লুইসকে নিয়ে আবার এ বাড়িতে আসেন। তখন বাড়ির সবকিছু তছনছ করেন। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর লুইসের বউকে বাড়িতে আনার প্রস্তুতি চলছিল। সিআইডি পরিচয়ধারীরা নববধূর কাপড়-চোপড় সব ছুড়ে মারতে থাকেন। এক পর্যায়ে চারটি মোবাইলসহ লুইসকে নিয়ে যান।’ তিনি জানান, লুইস থ্রি ডক্টরস-এ পড়াতেন।
নিখোঁজ ডা. শর্মিষ্ঠা মণ্ডলের বাবা ডা. দীনবন্ধু মণ্ডল বলেন, ‘সিআইডি পরিচয়ে ১৮ আগস্ট সকালে তার বানরগাতির সৎসঙ্গ বিহারের সামনের বাসা থেকে শর্মিষ্ঠাকে তুলে নেওয়া হয়। এ সময় তারা বাসায় ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেন। শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে যাওয়ার সময় তারা একটি মোবাইল ফোন নম্বর দেন। সেটি জুয়েল চাকমা নামে এক কর্মকর্তার নম্বর বলে তারা জানান। কিন্তু ওই নম্বরে কল দেওয়া হলে কেউ রিসিভ করে না। তাই ঢাকায় সিআইডি অফিসে লোক পাঠিয়ে জুয়েল চাকমার সঙ্গে কথা বলাই। তখন তিনি শুধু এটুকুই বলেন, ওরা ঢাকায় আছে।’ তিনি জানান, শর্মিষ্ঠা খুলনা মেডিক্যাল কলেজের কে ২৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী। বর্তমানে ইন্টার্নি করছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ১৮ আগস্ট সকালে খুলনার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি কোচিং ‘থ্রি ডক্টরস’-এর শিক্ষক ডা. ইউনুস উজ্জামান খান তারিমকে আটক করে সিআইডি। খুলনা সদর থানা পুলিশের ওসি হাসান আল মামুন সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন। পরদিন জানা যায়, ১৮ আগস্ট ভোররাত ও সকালে ডা. লুইস সৌরভ সরকার, ডা. নাদিয়া মেহজাবিন তৃষা, ডা. মুত্তাহিন হাসান লামিয়া ও ডা. শর্মিষ্ঠা মণ্ডল নিখোঁজ রয়েছেন। তাদেরও সিআইডি আটক করেছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের পক্ষ থেকেও একই অভিযোগ করা হয়। তবে সিআইডির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি।
