বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা কারাগারে - জনবার্তা
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা কারাগারে

জনবার্তা প্রতিনিধি
ডিসেম্বর ২৬, ২০২২ ৬:৩০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

দেশে রাজনৈতিক উত্তাপ না থাকলেও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানসহ গ্রেফতার হয়েছেন প্রায় ডজনখানে শীর্ষ নেতা।অন্যদিকে প্রায় দেড় বছর ধরে কারাবন্দি আছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নেয়া হয়। কারাগারে তারা প্রাপ্য মর্যাদাটুকুও পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। শীর্ষ নেতাদেরকে কারাগারে ডিভিশন পেতে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনেরা। স্বজনদের  অভিযোগ- গ্রেফতার নেতাদের মধ্যে কয়েকজন আগে থেকেই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তারা জটিল রোগের কারণে তারা নিয়মিত চিকিৎসকদের পরামর্শে চলতেন। কারাগারে যাওয়ার পর চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও বর্তমানে কারাগারে থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম নয়ন প্রমুখ।

এছাড়াও সারাদেশে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী প্রায় ২৪ হাজার গ্রেফতার করা হয়েছে মাত্র ১৫ দিনে। পুলিশ সদরদফতরের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সারা দেশে পুলিশের ১৫ দিনের বিশেষ অভিযানে ২৩ হাজার ৯৬৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ৩০ নভেম্বর শুরু হওয়া পুলিশের এ বিশেষ অভিযান ১৫ ডিসেম্বর শেষ হয়। দেশব্যাপী ৩৩ হাজার ৪২৯টি অভিযান চালিয়ে এসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি-গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে তালিকাভুক্ত জঙ্গি ও সন্ত্রাসী ৭২ জন। বিজয় দিবস, বড়দিন, খ্রিষ্টীয় বর্ষবরণ উদ্যাপন নিরাপদ ও নির্বিঘœ করতে এবং ঢাকায় আদালতফটক থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ বিশেষ অভিযান চালায় পুলিশ।

তবে বিএনপির অভিযোগ, তাদের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করতেই এ বিশেষ অভিযান। এর অংশ হিসেবে ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোয় তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছিল, যা সমাবেশের পর তুলে নেওয়া হয়। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন মামলায় পরোয়ানাভুক্ত ১৫ হাজার ৯৬৮ জন আসামী। আর অভিযান চলাকালে ৫ হাজার ১৩২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ৮ হাজার জনকে। অভিযানকালে ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২ লাখ ইয়াবা, ৮ কেজি ৬ গ্রাম হেরোইন ও ৫ হাজার ৪১৫ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করেছে পুলিশ। এরই মধ্যে নভেম্বরে বিএনপির বিভাগীয় পর্যায়ে গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতার শুরু করে পুলিশ। সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর নয়া পল্টনে বিএনপির গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার হন দলটির মহাসচিবসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা।

জামিন মেলেনি : পুলিশের ওপর হামলার পরিকল্পনা ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে পল্টন থানায় করা মামলায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের অন্তর্র্বর্তীকালীন জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। ২১ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আছাদুজ্জামানের আদালতে এ জামিন আবেদন করেন তাদের আইনজীবী। শুনানি শেষে বিচারক তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। ১৫ ডিসেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেন শুনানি শেষে আসামীদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। এরও আগে গত ১২ ডিসেম্বর মির্জা ফখরুল ও মির্জা আব্বাসসহ ২২৪ নেতাকর্মীর জামিন নামঞ্জুর করেছিলেন আদালত। গত ৮ ডিসেম্বর দিনগত রাতে নিজ বাসা থেকে ফখরুল ও আব্বাসকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। পরদিন ৯ ডিসেম্বর পুলিশ তাদের আদালতে হাজির করে। এসময় মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রেফতার বিএনপি নেতাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম। অন্যদিকে আসামীপক্ষের আইনজীবীরা জামিন আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিম জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। গত ৭ ডিসেম্বর বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এতে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। আহত হন অনেকে। এসময় বিএনপি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে চাল-ডাল, পানি, নগদ টাকা ও বিস্ফোরকদ্রব্য পাওয়া যায় বলে দাবি করে পুলিশ। সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৭৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় দেড় থেকে দুই হাজার বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামী করে মামলা করা হয়। রাজধানীর পল্টন মডেল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে এ মামলা করে। মামলার উল্লেখযোগ্য আসামীদের মধ্যে রয়েছেন- বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারপাসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল প্রমুখ। এদের মধ্যে আমান উল্লাহ আমান ও আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল জামিনে রয়েছেন।

এরআগে পুলিশের ওপর হামলার পরিকল্পনা ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে রাজধানীর পল্টন থানায় করা মামলায় বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালামসহ ৩৮ নেতাকর্মীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন আদালত। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেন শুনানি শেষে তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। এদিন বিএনপির ৩৮ নেতাকর্মীর জামিন চেয়ে শুনানি করেন তাদের আইনজীবীরা। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জামিনের বিরোধিতা করা হয়। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেকের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।

এদিকে নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। ২৫ ডিসেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শেখ সাদির আদালত এ আদেশ দেন। এদিন তিন দিনের রিমান্ড শেষে শফিকুর রহমানকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো. আবুল বাসার। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এর আগে গত ১৩ ডিসেম্বর আদালত তার সাত দিনের ও ২১ ডিসেম্বর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গত ১৩ ডিসেম্বর বেলা ১১টার দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) ফারুক হোসেন ডা. শফিকুর রহমানকে গ্রেফতার করার বিষয়টি জানান।

জামায়াতের আমিরকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন দলটির নেতাকর্মীরা। কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলটি রাজধানীর মৌচাক মার্কেটের সামনে থেকে শুরু হয়ে মালিবাগ রেলগেটে প্রতিবাদ সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। বিক্ষোভ মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে জামায়াতের পক্ষ থেকে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ দাবি করে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির জন্য ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করার পরপরই ফ্যাসিস্ট সরকার অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে ডা. শফিকুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে। আমরা এই গ্রেফতারের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে আমীরে জামায়াতের মুক্তির দাবি জানাচ্ছি। তিনি বলেন, মূলত জনগণের ১০ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতেই আমিরে জামায়াতকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছি, সরকারের এই গ্রেফতার, হামলা-মামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে দেশের মানুষের মুক্তির জন্য চলমান এই আন্দোলনকে বন্ধ করা যাবে না। এর আগে গত ৯ নভেম্বর সিলেট থেকে গ্রেফতার করা হয় ডা. শফিকুর রহমানের ছেলে ডা. রাফাত সাদিককে। এদিকে গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ভাটারা এলাকার একটি বাড়ি থেকে মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে একটি মামলায় গত ৩০ মে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ছাড়াও কারাগারে বন্দি আছেন- জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সাবেক এমপি মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম ও সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানসহ আরো কয়েকজন।