ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ঘিরে অসংখ্য মানুষের ভিড়। মূল ফটকে প্রবেশ করতেই আইনজীবী আর পুলিশের ব্যস্ততা চোখে পড়ল। সেখানে বিচারপ্রার্থীরা মলিন মুখ করে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। তাদেরকে ছাপিয়ে চোখ আটকে গেল এক শিশুর দিকে। তার নাম ফাতেমা। কাছে যেতে যেতেই মায়ের কোলে উঠে গেল সাড়ে তিন বছর বয়সী ওই শিশু।
আজ সোমবারে প্রথম প্রহরেই আদালত প্রাঙ্গণে অপেক্ষার কারণ জানতে চাওয়া হয় ফাতেমার মায়ের কাছে। এরইমধ্যে শিশু ফাতেমা বলল, ‘এখানে বাবা, বাবাকে নিতে এসেছি’, ‘বাবা পুলিশের কাছে।’ অবুঝ ফাতেমা কখনো হাসছে, কাঁদছে আবার কখনো বাবাকে দেখতে চাইছে। তার এমন জিজ্ঞাসায় সান্ত্বনা দিতে গিয়েও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে পরিবারের সদস্যরা।
শিশুটির মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফাতেমার বাবা মো. শাজিদ খান রাজধানীর মৌচাক এলাকার একটি মার্কেটে কাপড়ের ব্যবসা করেন। অন্যন্য দিনের মতো প্রয়োজনীয় কাজ শেষে শাহজাহানপুরের বাসায় ফেরার পথে পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়েন। কোন অপরাধে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার পরও তাকে আটক করা হয়। এর কারণ হিসেবে পুলিশ জানায় তার মোবাইলে একটি ছবি পাওয়া গেছে যেখানে বিএনপির রাজনীতি করেন এমন একজন রয়েছেন। পরে তাকে রাজনৈতিক মামলায় অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আদালত প্রাঙ্গণে ফাতের বাবা সাজিদের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার জান্নাত বলেন, ‘সে (সাজিদ) কোন রাজনীতি করতো না। ব্যবসার তাগিদে নানা লোকজনের সঙ্গে পরিচয় ছিল। সে কারণে বিএনপি করে এমন লোকের সাথে ছবি থাকতেই পারে। তবে এটা কোন অপরাধ?’
‘পুলিশের ইচ্ছে হলেই কাউকে ধরে নিয়ে জেলে দিচ্ছে। আমরা সাধারণ মানুষ ঝামেলায় পড়ে যাচ্ছি। আমাদের কিছু করার নাই..’ বলছিলেন তাসলিমা।
এর আগে কথা হয় সাজিদের ভাই মো. ইমরান খানের সাথে। তিনি বলেন, ‘গত ২২ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তারের পর শাহজাহানপুর থানার এসআই নুরুল আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি ভাইকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলে প্রথমে আমাদের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন। আমরা নানাভাবে বুঝিয়ে তাকে ২০ হাজার টাকা পাঠাই, তবুও ভাইকে ছাড়েনি তারা। এরপর জিজ্ঞেস করলে তারা জানায় সহজ করে মামলা দেয়া হবে দ্রুত জামিনে বের হওয়া যাবে।’
ইমরানের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যোগাযোগ করা হয় শাহজাহানপুর থানায়। তবে এসআই নুরুল ইসলাম এরইমধ্যে ওই থানার দায়িত্ব ছেড়ে প্রশিক্ষণে যোগ দিয়েছেন বলে জানানো হয়। ফলে তার মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
পরিবারের অন্য এক সদস্য বলেন, ‘নিরপরাধ হওয়ার পরও তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। এসব বিষয় নিয়ে অভিযোগ করতে গেলে আবারও হয়রানির শিকার হতে হবে।’
শিশু ফাতেমার পরিবারের মতো অসংখ্যা পরিবারের সদস্যরা সিএমএম কোর্ট প্রঙ্গণে ভিড় করেছেন। তাদের অনেকেরই প্রিয়জন কোন অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানা গেছে। এমন পাঁচ পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। যাদের স্বজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাদের কাউকে আবার মাদক মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সূত্র : দেশ রূপান্তর
