জেলা শহরেও বাড়ছে ডেঙ্গু, ঢাকায় ১৫ দিনে ১২৭ প্রাণহানি - জনবার্তা
ঢাকা, সোমবার, ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জেলা শহরেও বাড়ছে ডেঙ্গু, ঢাকায় ১৫ দিনে ১২৭ প্রাণহানি

জনবার্তা প্রতিবেদন
আগস্ট ১৬, ২০২৩ ১২:৫০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। ইতোমধ্যেই দেশের প্রায় সব জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে এডিস মশাবাহী এই রোগ। হাসপাতালগুলোয় ক্রমাগত বাড়ছে রোগীদের ভিড়। এরমধ্যে চলতি আগস্টের প্রথম ১৫ দিনে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ডেঙ্গুতে প্রাণহানি ঘটেছে ১২৭ জনের। আর এই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় মশাবাহী রোগটিতে মারা গেছেন ৪৮ জন। সবমিলিয়ে গত ১৫ দিনে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৭৫ জনের।

যেখানে ২০২১ সালে দেশব্যাপী এডিস মশাবাহী রোগ ডেঙ্গুতে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আর গতবছর মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ২৮১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আগস্টের ১৫ দিনে ডেঙ্গুতে মৃত ১৭৫ জনের মধ্যে ১ আগস্ট মারা যান ১০ জন। পাশাপাশি ২ আগস্ট ১২ জন ছাড়াও ৩, ৪, ৫, এবং ৬ আগস্ট ১০ জন করে মোট ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী মারা যান। এছাড়া ৭ আগস্ট ১৪ জন, ৮ আগস্ট ১৩ জনসহ ৯ ও ১০ আগস্ট ১২ জন করে মোট ২৪ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়।

এদিকে, গত ১১ আগস্ট ৯ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়। পাশাপাশি ১২ আগস্ট ১৪ জন এবং ১৩ আগস্ট মারা গেছেন ১১ জন। এছাড়া গত ১৪ আগস্ট সর্বোচ্চ ১৮ জন ডেঙ্গু রোগী মারা যান। সবশেষ গতকাল নতুন করে আরও ১০ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত ৯ হাজার ১১৭ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৪ হাজার ১০ জন। পাশাপাশি ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি আছেন ৫ হাজার ১০৭ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর

অন্যদিকে, গত ১৫ দিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮ হাজার ৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী। এরমধ্যে শুধু ঢাকাতেই ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ১৫ হাজার ১৯৬ জন। আর এই সময়ে ঢাকার বাইরে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৮৩৮ জন। এরমধ্যে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯০৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন গত ১৩ আগস্ট।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮৯ হাজার ৮৭৫ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৪৪ হাজার ৩৯৬ জন। পাশাপাশি ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৭৯ জন। একই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৮০ হাজার ৩৩২ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৪০ হাজার ৬৩ জন এবং ঢাকার বাইরের ৪০ হাজার ২৬৯ জন।

বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত ৯ হাজার ১১৭ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৪ হাজার ১০ জন। পাশাপাশি ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি আছেন ৫ হাজার ১০৭ জন।

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, সারাদেশে ডেঙ্গু রোগী দশ গুণ বেড়েছে। এ কারণে স্যালাইনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

গত ১২ আগস্ট গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জাহিদ মালেক আরও জানান, সবগুলো ওষুধ কোম্পানি মিলেও এতো স্যালাইন উৎপাদন করতে পারছে না। এজন্য গত দুই দিন আগে মিটিং করেছি। সেখানে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন প্রয়োজনে বিদেশ থেকে স্যালাইন আমদানি করা হয়।

বর্ষা মৌসুম, বৃষ্টি-বাদলা হয়ে বিভিন্ন স্থানে পানি জমা হয়ে থাকায় মশা বাড়ছে বলে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আশা করছি আগামীতে মশা কমে আসবে এবং ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও কমে আসবে। ডেঙ্গু কমাতে হলে মশা কমাতে হবে। মশা কমলে ডেঙ্গু রোগী কমবে এবং সে জন্য নিয়মিত স্প্রে করতে হবে বেশি বেশি।

অন্যদিকে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর নিপসম অডিটোরিয়ামে ‘সেমিনার অন চ্যালেঞ্জ টু প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল অব ডেঙ্গু ইন বাংলাদেশ: দ্যা ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক সেমিনারে এমন পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সামিয়া তাহমিনা বলেন, দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আমরা এখন ডেঙ্গু মহামারিতে আছি কি না, এর কোনো সরাসরি উত্তর নিতে চাচ্ছি না। শুধু বলব আমরা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে এসেছি। হাসপাতালগুলো রোগীতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। মুগদা মেডিকেলে রোগী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগী ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে। তারা জটিল রোগীদের ভর্তি করছেন না। এটি অত্যন্ত আতঙ্কের একটি পরিস্থিতি।

ডেঙ্গু মোকাবেলায় নেওয়া কার্যক্রম প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক এই অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস সার্ভের বাইরে আমার তেমন কিছুই করতে পারি না। এর কারণ আমাদের বেশ কিছু এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি। আমাদের কাজে ভুল রয়েছে। ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগে আমাদের লার্ভিসাইটিং করতে হবে যেন এডিসের লার্ভা ধ্বংস করতে পারি। কিন্তু আমাদের করা হচ্ছে ফগিং। অথচ ফগিং এডাল্ট মশা নিধনের জন্য প্রয়োগ করা হয়। তাও বর্তমানে কতটা কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডেঙ্গু ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে অধ্যাপক তাহমিনা বলেন, তিন ধরনের ডেঙ্গু ভ্যাকসিন রয়েছে। এর দুইটি বাজারে রয়েছে। অপরটি ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে। এর একটি ফিলিপাইনে ডিজাস্টার ঘটিয়েছে। ফলে এটি ব্যবহারের বিষয়ে এখনও চিন্তা-ভাবনা চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। নিরাপদ নিশ্চিত হওয়ার পর এটি ব্যবহারের বিষয়ে ভাবা যেতে পারে।

অন্যদিকে, সেমিনারে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ সরকার কখনোই গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময়েও বাংলাদেশে সরকারিভাবে গেজেটের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও তা নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র ও গণপূর্তসহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

দেশে ডেঙ্গুর ধরন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের দেশে এখন ডেঙ্গুর চারটি ধরনই পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধরন অধিক বলে জানা গেছে। একাধিক ধরন একটিভ থাকায় ঝুঁকি অধিক। তাই সকল ডেঙ্গু রোগীকে পরিপূর্ণ বেড রেস্ট এবং চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। অন্যথায় বিপদের শঙ্কা রয়েছে।